এক মন যার সে-ই যেতে পারে

ফরাসী বিপ্লবের এক বিস্ময়কর ঘটনা নিয়ে আমার আজকের লেখা। ১৬ জন কার্মেলাইট নান এর গিলোটিনে মৃত্যু। এই মৃত্যুই ভয়ঙ্কর শাসন ও রোবসপিয়ের এর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছিল। আমাদের ইউরোপ সফরের দৌলতে এক জার্মান মিউজিকলজিস্ট এর সাথে আলাপ হয়। ওঁর কাছেই এই ঘটনার কথা জানতে পারি। কি ছিল এই নান দের মৃত্যুর আগে শেষ আশ্রয়? কেন তাঁরা গিলোটিনে শিরোচ্ছেদের ভয় না পেয়ে উৎসবে মেতেছিল? নিজের কৌতূহলবসতই একটু জানার চেষ্টা করলাম।

ফরাসী বিপ্লবের মূল মন্ত্র ছিল Anti-Clericalism, অর্থাৎ ধর্মীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধতা। তার আগে ক্যাথলিক চার্চের হাতেই ছিল সমস্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা। সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাপনে ছিল না কোনো স্বাধীনতা। খেলাটা আরো অনেক টা ঘুরে গেল যখন জ্যাকোবিন শাসনের নেতারা শুধু আইন বানিয়ে ক্ষমতা আর অর্থ কেড়ে নেওয়াতে সন্তুষ্ট হলো না। রোবসপিয়ের এর নেতৃত্বে ভয়ঙ্কর শাসন শুরু হলো। এই সময়ে হাজার হাজার ক্যাথলিক চার্চ অনুগামীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যাতে সেই ধর্মের ও মতাদর্শের চিহ্ন পর্যন্ত না থাকে।

প্যারিসের উত্তরে কম্পিয়েন শহরের কার্মেলাইট নান রা তাঁদের ক্যাথলিক চার্চের মতাদর্শে অনড় ছিল, তাই ১৭৯৪ এর জুন মাসে তাঁদের হেফাজতে নেওয়া হয়, কারণ সারা ফ্রান্স জুড়ে তখন ক্যাথলিক চার্চ কে একদম নির্মূল করার হত্যাযজ্ঞ চলছিল।

এইবার আসি মূল বক্তব্যে। এই ১৬ জন নান খুব ভালো ভাবে জানতো যে তাঁদের জীবনের বলিদান ভয়ঙ্কর শাসন কে শেষ করবে এবং বৃহত্তর ফ্রান্স কে এই Barbaric governance থেকে মুক্তি দেবে। তাই তাঁদের শিরোচ্ছেদে মৃত্যু হবে জেনেও কোনো রকম আর্তনাদ/হাহাকার শোনা যায়নি, বরঞ্চ উল্টে কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে বসেও তাঁরা গান তৈরি করেছিল। সেই গানের প্রথম চার লাইন ছিল এরকম:
‘Give over our hearts to joy, the day of glory has arrived
Far from us all weakness, seeing the standard come
We prepare for the victory, and we all march to the true conquest
Under the flag of the dying God, we run, we all seek the glory’

এই ঘটনা সাংঘাতিক আলোড়ন ফেলেছিল-তাদের শেষ সঙ্গী হয়েছিল গান।
প্যারিস শহরের ভেতরে গিলোটিন অবধি যাওয়ার পথে তারা প্রশান্তির গান ছড়িয়ে দিয়েছিল। ১৬ জন কার্মেলাইট নান তাদের জীবন চর্যা ও মতাদর্শ ছাড়বে না বলে এবং বৃহত্তর ফ্রান্সকে ভয়ংকর শাসন থেকে মুক্তি দেবে বলে গিলোটিনে আনন্দের সাথে মাথা পেতে দিয়েছিল। সেই পথে যেতে যেতে তারা গেয়েছিল ক্ষমার গান, শান্তির গান, সাম্যের গান। তাঁরা গেয়েছিল ‘মিসেরেরে (Miserere)’ ‘সালভা রেগিনা (Salva Regina)’ ‘টে ডিয়াম (Te deum)’।
কোনো ভয় নেই, সকলের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ, সেই কারণেই এই ধরণের গান গাইতে পেরেছিল তাঁরা। গিলোটিন যন্ত্রের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা একসাথে গেয়েছিল ‘ভেনি ক্রিয়েটর স্পিরিটাস (Veni creator spiritus)’।
এই গানগুলো যখন বারবার শুনছি, এর পাশেই আমাদের বাংলার সুর একই ভাবে ভেসে আসছে মনে। কোথাও যেন একটা অদ্ভুত মিল। ভবা পাগলার লেখা, ‘আমার নিতাই চাঁদের বাজারে আমার গৌরচাঁদের দরবারে, এক মন যার সে-ই যেতে পারে’। লালনের গান ভেসে এলো
‘প্রহ্লাদ চরিত্র দেখো ছিল চিত্রধামে, কত কষ্ট হল রে তার সেই কৃষ্ণ নামে, তারে আগুনে পুড়ালো জলেতে ডুবালো, তবু না ছাড়িল সে শ্রীরূপ সাধনা’
ঠিক একই সময় রবীন্দ্রনাথের গানও মাথায় ঘুরছিল ‘আপন মনের অন্ধকারে ঢাকল যারা, আমি তাদের মধ্যে আপনহারা, ছুঁইয়ে দিল সোনার কাঠি ঘুমের ঢাকা গেল কাটি গো, নয়ন আমার ছুটেছে গো তার আলো করা মুখের পানে’…
এই মৃত্যুপথযাত্রী 16 Carmelite sisters গানকে তাঁদের শেষ আশ্রয় করেছিল-এই ঘটনা পড়ে/জেনে আমি ভীষণভাবে অবাক ও বিস্মিত হয়েছি। তারপর কিছুটা পড়াশোনা ও অনেকটা ভাবনাচিন্তার পর সত্যি করে অনুভব করলাম ভবা পাগলার কথা-
‘এক মন যার সে-ই যেতে পারে’।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s